সাপ্লায়ার ঠিক হয়েছে, দাম ঠিক হয়েছে, এখন টাকা পাঠানোর পালা। চীন থেকে পণ্য আমদানি ঠিক এই জায়গাটাতেই বেশিরভাগ মানুষের হাত থেকে ফসকে যায় — কেনার ধাপটা সহজ, কিন্তু কেনার পর কার্টনটা কোথায় যাবে, কে আনবে, বন্দরে কী চাওয়া হবে, সেটা কেউ ধাপে ধাপে বলে দেয় না।
পুরো পথটা 11 ধাপের। তার মধ্যে 6 ধাপ আপনার নিজের হাতে। আর যেখানে টাকা বা সময় নষ্ট হয়, তার প্রায় পুরোটাই ওই 6 ধাপের ভিতরে। দুশ্চিন্তাটা অবশ্য সবার কাস্টমস নিয়ে।
পুরো পথটা দেখতে কেমন
নিচের টেবিলটা একবার পড়ে রাখলে বাকি লেখাটা জায়গামতো বসবে। ডান কলামটাই আসল — কোন ধাপে কী ভুল হয়।
| ধাপ | কে করে | যেখানে ভুল হয় |
|---|---|---|
| 1. রেজিস্ট্রেশন, ওয়্যারহাউজের ঠিকানা পাওয়া | আপনি | — |
| 2. সাপ্লায়ার বাছাই | আপনি | — |
| 3. পণ্যে অনুমোদন লাগে কি না দেখা | আপনি | প্রায় কেউ দেখে না |
| 4. কার্টনের মাপ আর ওজন চেয়ে নেওয়া | আপনি | সবচেয়ে দামি প্রশ্ন, সবচেয়ে কম জিজ্ঞাসিত |
| 5. দাম ওয়্যারহাউজ পর্যন্ত ধরা আছে কি না | আপনি | না থাকলে আলাদা খরচ |
| 6. অর্ডার, প্রাপকের নাম ঠিকভাবে লেখা | আপনি | ভুল প্রাপক, বদলে দেওয়া ফোন নম্বর |
| 7. সাপ্লায়ারের ট্র্যাকিং নম্বর জানানো | আপনি | না জানালে পার্সেল মেলানো যায় না |
| 8. পার্সেল বুঝে নেওয়া, ছবি তোলা | আমরা | — |
| 9. জমা রাখা, একসাথে করা, রিপ্যাক | আমরা | ওয়্যারহাউজকে স্টকরুম বানালে খরচ |
| 10. ফ্রেইট, কাস্টমস ছাড়, কাগজপত্র | আমরা | অনুমোদন না থাকলে এখানেই আটকায় |
| 11. ডেলিভারি, খুলে দেখা | আপনি | দেরি করলে দাবির সময় পেরিয়ে যায় |
অর্ডার দেওয়ার আগে চারটে জিনিস হাতে রাখুন
টাকা পাঠানোর পর এই চারটের একটাও আর বদলানো যায় না। তাই কাজগুলো অর্ডারের আগের, পরের নয়।
01
প্যাক করা কার্টনের মাপ আর ওজন চেয়ে নিন। ওজন সবাই বলে দেয়, মাপ বলে খুব কম। অথচ এয়ার ফ্রেইটে বিল হয় প্রকৃত আর আয়তনিক ওজনের মধ্যে যেটা বেশি তার উপর, আর আয়তনিক ওজন মাপ ছাড়া বেরই করা যায় না — তিন মাপ গুণ করে 6000 দিয়ে ভাগ। কাপড় বা জুতার মতো হালকা অথচ জায়গা-খাওয়া পণ্যে এই দুটো সংখ্যা অনেক দূরে দূরে দাঁড়ায়। চার্জেবল ওজন কোন ভিত্তিতে বসে বিভাগে ধাপগুলো আলাদা করে লেখা আছে।
02
পণ্যটার আগে অনুমোদন লাগে কি না দেখে নিন। এটাই সেই ধাপ যেটা বাদ পড়ে, আর বাদ পড়লে পুরো চালানের ঝুঁকি। কোন পণ্যে কার অনুমোদন, তার তালিকা নিচেই আছে।
03
ঠিকানার লাইনগুলো কপি করুন, টাইপ করবেন না। Recipient-এর ঘরে থাকবে ওয়্যারহাউজের দেওয়া নাম, আর আলাদা Shipping Mark লাইনে LogiBangla/আপনার ইংরেজি নাম। আর ফোন নম্বরের ঘরে ওয়্যারহাউজের নম্বরটাই থাকবে — নিজের নম্বর বসিয়ে দিলে চীনের কুরিয়ার বাংলাদেশি মোবাইলে ফোন করে ডেলিভারি ব্যর্থ করে ফেরত নিয়ে যায়। নাম ছাড়া পৌঁছানো কার্টন কোন অ্যাকাউন্টের, সেটাও মেলানো যায় না।
04
এয়ার না সি, ঠিক করুন এখনই। সি ফ্রেইটে বিল হয় আয়তনে — তিন মাপ গুণ করে 1,000,000 দিয়ে ভাগ করলে CBM। দুই মাধ্যমেই সর্বনিম্ন 0.5 ধরা হয়, তাই খুব ছোট চালান আলাদা পাঠানো প্রায় সবসময় অপচয়। মাধ্যম বেছে নেওয়ার মুহূর্তটা অর্ডারের সময়েই, কারণ কার্টন একবার বাঁধা হয়ে গেলে হিসাব আর নড়ে না।
কোন পণ্যে আগে অনুমোদন লাগে
বাংলাদেশে কিছু পণ্য আমদানি করা যায়, কিন্তু নির্দিষ্ট সংস্থার অনুমোদন নিয়ে। সাপ্লায়ার এটা জানেন না, আর জানার কথাও নয়। প্রশ্নটা আমদানিকারকের দিকের।
| পণ্য | কার অনুমোদন | কারণ |
|---|---|---|
| ওয়াকিটকি, সিগন্যাল বুস্টার | BTRC | রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে |
| ড্রোন | BTRC ও CAAB | একইসাথে ট্রান্সমিটার ও উড়োযান |
| কসমেটিকস | BSTI | বাধ্যতামূলক মান সনদ |
| ফুড সাপ্লিমেন্ট | BSTI ও BFSA | খাদ্য নিরাপত্তা ছাড় |
| ওষুধ, চিকিৎসা যন্ত্র | DGDA | নিবন্ধন ছাড়া আমদানি নয় |
| পাওয়ার ব্যাংক, লিথিয়াম ব্যাটারি | এয়ারলাইন (carrier) ও IATA | খোলা সেল বিপজ্জনক পণ্য |
তালিকাটা যতটা ছোট দেখাচ্ছে, নিয়মটা তার চেয়ে চওড়া। BTRC-র নিবন্ধন লাগে এমন যন্ত্রের মধ্যে রাউটার, হ্যান্ডসেট আর ব্লুটুথ যন্ত্রপাতিও পড়ে — অর্থাৎ ইলেকট্রনিক্সের বড় অংশটাই কোনো না কোনো নিবন্ধনের ভিতরে। মান সনদের তালিকা BSTI নিজে প্রকাশ করে, আর সেটাই দেখার জায়গা।
এই তালিকা আমদানি নীতি আদেশের অনুলিপি নয়, আর এখানে নাম না থাকা মানে ছাড়পত্র নয়। চুম্বক, পারফিউম, রং, বীজ বা পুরনো যন্ত্র — এগুলোর উত্তর চালানভেদে বদলায়। অর্ডারের আগে ডেস্কে জিজ্ঞেস করে নিলে খরচটা শূন্য, পরে জিজ্ঞেস করলে নয়।
দেশে পৌঁছানোর পর কী হয়
চালান বন্দরে নামার পর শুল্ক বসে অ্যাসেসেবল ভ্যালুর উপর, আর সেটা সবসময় ইনভয়েসের অঙ্ক নয়। বাংলাদেশ কাস্টমস নিজেদের প্রকাশিত নিয়মে লেনদেন-মূল্যকে ভিত্তি ধরে, প্রয়োজনে নির্দিষ্ট কিছু সমন্বয় করে। কোন হারে বসবে সেটা ঠিক করে পণ্যের HS কোড — HS কোড আর শুল্ক নির্ধারণের ধাপ বিভাগে সেটা আলাদা করে ধরা আছে।
কাগজপত্রের তালিকাটা মোটামুটি একই থাকে: বাণিজ্যিক ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, বিল অব লেডিং বা এয়ারওয়ে বিল, আর উৎস দেশের সনদ। এই কাগজগুলো একে অন্যের সাথে মেলানো হয়, তাই সাপ্লায়ারের ইনভয়েসে পণ্যের বর্ণনা অস্পষ্ট থাকলে প্রশ্ন সেখান থেকেই শুরু হয়।
একটা সময়সীমা জেনে রাখা ভালো, কারণ এটা দেখে আসে না। পণ্য পৌঁছে যাওয়া মানেই ঝুঁকি শেষ নয় — কাস্টমস ছাড় না নিয়ে পড়ে থাকা চালান আকাশপথে 21 দিন আর সমুদ্রপথে 30 দিন পর নিলামে ওঠার আওতায় পড়ে যায়। ছাড়ের কাজটা আমাদের, কিন্তু কোন কাগজ বা অনুমোদনের অভাবে আটকে আছে সেটার উত্তর প্রায়ই আসে আপনার দিক থেকে।
খরচ আর সময় কোথায় দাঁড়ায়
ফ্রেইটের দামে ধরা থাকে ওয়্যারহাউজে পণ্য বুঝে নেওয়া, জমা রাখা, একসাথে করা আর মৌলিক রিপ্যাক, ফ্রেইট, এবং কাস্টমস ছাড় ও কাগজপত্র। আলাদা হিসাবে যায় 30 দিনের বেশি জমা রাখা, বিশেষ প্যাকেজিং, বাসায় ডেলিভারি, আর সাপ্লায়ার ওয়্যারহাউজ পর্যন্ত খরচ না দিয়ে থাকলে সেই অংশটা। শুল্ক আর ভ্যাটের অঙ্ক ছাড়ের পর জানা যায়, কারণ সেটা HS কোড আর ঘোষিত মূল্যের উপর দাঁড়ায় — শিপমেন্টের আগেই ডেস্ক থেকে হিসাবটা চেয়ে নেওয়া যায়।
সময়ের দিকে একটা সংখ্যা কাজে লাগে: চীনের ওয়্যারহাউজে পৌঁছানোর পর বেশিরভাগ চালান 3-4 দিনের মধ্যে ছাড়ে। 30 দিনের ফ্রি স্টোরেজ আছে ঠিকই, কিন্তু সেটা অপেক্ষা করতে হওয়া চালানের জন্য রাখা ছাদ — স্বাভাবিক গতি নয়। কয়েক সাপ্লায়ারের কার্টন একসাথে করতে চাইলে ওই জানালাটাই কাজে লাগে, আর তাতে সর্বনিম্ন চার্জ একবার লাগে, কয়েকবার নয়। ল্যান্ডেড কস্ট বের করার হিসাব বিভাগে প্রতিটি লাইন আলাদা করে সাজানো।
বিমা চাইলে নেওয়া যায়, ঘোষিত মূল্যের 1.5% হারে। এটা নিজে থেকে চালু হয় না — প্রতিটি শিপমেন্টের জন্য সাপোর্টে বলে চালু করিয়ে নিতে হয়, আর সেটা না করলে দাবির সময় কিছু থাকে না। ক্ষতির দাবি জানাতে হয় ডেলিভারির 24 ঘণ্টার মধ্যে, ছবি আর ইনভয়েস সহ।
কার্টন হাতে পাওয়ার দিনই খুলে দেখুন আর ছবি তুলে রাখুন। এক সপ্তাহ বন্ধ পড়ে থাকা কার্টনের ভিতরে যা-ই থাকুক, 24 ঘণ্টার জানালা ততক্ষণে পেরিয়ে গেছে।
প্রথম চালানটা ছোট রাখলে শেখার খরচও ছোট থাকে। এক সাপ্লায়ার, এক কার্টন, মাপ আর ওজন হাতে — এই তিনটে নিয়ে একবার পুরো পথটা ঘুরে এলে দ্বিতীয়বার অনুমানের জায়গা প্রায় থাকে না। রিপ্যাকিং, বিমা আর দাবির নিয়ম বিভাগে ঝুঁকির দিকটা আলাদা করে লেখা।
প্রশ্ন ও উত্তর
চীন থেকে পণ্য আনতে কত দিন লাগে?
ওয়্যারহাউজে পার্সেল পৌঁছানোর পর বেশিরভাগ চালান 3-4 দিনের মধ্যে ছাড়ে। এরপরের সময়টা মাধ্যম, চালানের ধরন আর কাস্টমসের উপর নির্ভর করে, তাই নির্দিষ্ট তারিখ ডেস্ক থেকে শিপমেন্ট ধরে জেনে নেওয়াই ঠিক।
চায়না থেকে কি কি পণ্য আমদানি করা যায়?
সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্যের বড় অংশই আনা যায়। আলাদা করে দেখতে হয় দুই ধরনের জিনিস — যেগুলোর আগে অনুমোদন লাগে, যেমন BTRC-র আওতায় রেডিও যন্ত্র বা BSTI-র আওতায় কসমেটিকস, আর যেগুলো কনসলিডেটেড ফ্রেইটে একেবারেই যায় না, যেমন দাহ্য তরল বা অ্যারোসল।
অর্ডার করার আগেই খরচ বের করা যায়?
কার্টনের মাপ আর ওজন হাতে থাকলে যায়। এয়ার ফ্রেইটে বিল হয় চার্জেবল ওজনে — প্রকৃত আর আয়তনিক ওজনের মধ্যে যেটা বেশি, আর আয়তনিক ওজন হলো (দৈর্ঘ্য × প্রস্থ × উচ্চতা cm) ÷ 6000। শুল্ক আর ভ্যাটের অঙ্কটা আলাদা, কারণ সেটা HS কোড আর ঘোষিত মূল্যের উপর দাঁড়ায়।
আলিবাবা বা 1688 থেকে কেনা পণ্য আনা যায়?
যায়। চীনের ভিতরের ঠিকানায় পাঠাতে বিক্রেতার কোনো অসুবিধা হয় না, আর ওয়্যারহাউজের ঠিকানাটা তাদের কাছে দেশের ভিতরের সাধারণ ডেলিভারি। শুধু Shipping Mark লাইনে LogiBangla/আপনার ইংরেজি নাম থাকতে হবে, আর ফোন নম্বরের ঘরে ওয়্যারহাউজের নম্বরটাই।
পার্সেল ওয়্যারহাউজে পৌঁছেছে কি না বুঝব কীভাবে?
সাপ্লায়ারের ট্র্যাকিং নম্বরটা আমাদের জানিয়ে রাখলে পার্সেল পৌঁছানোর সাথে সাথে সেটা আপনার অ্যাকাউন্টে মিলিয়ে দেওয়া হয়, আর বুঝে নেওয়ার সময় ছবি তুলে রাখা হয়। নম্বর না থাকলে কার্টন কোন অ্যাকাউন্টের, সেটা মেলানো কঠিন হয়ে যায়।
নিজের কার্টনের হিসাব দেখে নিন
মাপ আর ওজন বসালেই চার্জেবল ওজন কোন ভিত্তিতে দাঁড়াচ্ছে দেখা যায় — সাইনআপ ছাড়াই।